এল নিনো (El Nino)
বিশ্বের আবহাওয়া ও জলবায়ু নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে বেশি আলোচিত বিষয়গুলোর একটি হলো এল নিনো (El Niño)। আন্তর্জাতিক আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ সংস্থাগুলোর সর্বশেষ বিশ্লেষণ বলছে, ২০২৬ সালে আবারও এল নিনো পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এর ফলে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে তাপপ্রবাহ, খরা, অতিবৃষ্টি, বন্যা এবং কৃষি উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব দেখা দিতে পারে।
বাংলাদেশের মতো জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্যও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। তাই এল নিনো কী, কেন হয়, কত বছর পরপর আসে, বর্তমানে এর অবস্থা কী এবং এর সম্ভাব্য প্রভাব মোকাবিলায় কী করণীয়—এসব বিষয়ে বিস্তারিত জানা জরুরি।
এল নিনো (El Nino) কী?
এল নিনো হলো প্রশান্ত মহাসাগরের (Pacific Ocean) মধ্য ও পূর্বাঞ্চলের সমুদ্রপৃষ্ঠের পানি স্বাভাবিকের তুলনায় অস্বাভাবিকভাবে উষ্ণ হয়ে যাওয়ার একটি প্রাকৃতিক জলবায়ুগত ঘটনা।
পৃথিবীর আবহাওয়া ব্যবস্থার ওপর সমুদ্রের তাপমাত্রার ব্যাপক প্রভাব রয়েছে। যখন প্রশান্ত মহাসাগরের বিশাল এলাকাজুড়ে পানির তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেড়ে যায়, তখন বায়ুমণ্ডলের স্বাভাবিক ভারসাম্যে পরিবর্তন আসে। এর প্রভাব ধীরে ধীরে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাত এবং আবহাওয়ার ধরনে প্রতিফলিত হয়। এই ঘটনাকেই বলা হয় এল নিনো।
এল নিনো (El Nino) শব্দের উৎপত্তি
"El Niño" শব্দটি স্প্যানিশ ভাষা থেকে এসেছে, যার অর্থ "ছোট ছেলে" বা "খ্রিস্ট শিশু"। দক্ষিণ আমেরিকার উপকূলীয় জেলেরা শত শত বছর আগে বড়দিনের সময় সমুদ্রের পানি অস্বাভাবিকভাবে উষ্ণ হতে দেখেছিলেন। সেই পর্যবেক্ষণ থেকেই এই নামের উৎপত্তি।
এই গরমে রিচ ফুডের ভয়াবহতা দেখতে এখানে ক্লিক করুন
এল নিনো কীভাবে তৈরি হয়?
স্বাভাবিক অবস্থায় প্রশান্ত মহাসাগরে পূর্ব দিক থেকে পশ্চিম দিকে প্রবাহিত বাণিজ্যিক বায়ু (Trade Winds) উষ্ণ পানিকে ইন্দোনেশিয়া ও অস্ট্রেলিয়ার দিকে ঠেলে নিয়ে যায়। একই সময়ে দক্ষিণ আমেরিকার উপকূলে সমুদ্রের গভীর থেকে অপেক্ষাকৃত ঠান্ডা ও পুষ্টিসমৃদ্ধ পানি উপরে উঠে আসে।
কিন্তু যখন এই বায়ুপ্রবাহ দুর্বল হয়ে পড়ে, তখন উষ্ণ পানি পূর্ব দিকে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। ফলে মধ্য ও পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরের পানির তাপমাত্রা বৃদ্ধি পায় এবং পৃথিবীর আবহাওয়া ব্যবস্থায় পরিবর্তন শুরু হয়। এর ফলেই দেখা দেয় এল নিনো।
কত বছর পরপর এল নিনো আসে?
এল নিনো নির্দিষ্ট কোনো সময়সূচি অনুসরণ করে না। সাধারণত প্রতি ২ থেকে ৭ বছর পরপর এটি দেখা দিতে পারে।
একটি এল নিনো ঘটনা সাধারণত ৯ মাস থেকে ১৮ মাস পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এর প্রভাব আরও দীর্ঘ সময় ধরে অনুভূত হয়। সব এল নিনো সমান শক্তিশালী হয় না। কিছু এল নিনো তুলনামূলক দুর্বল হলেও কিছু ঘটনা বৈশ্বিক আবহাওয়ায় বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটায়।
ইতিহাসে ১৯৮২-৮৩, ১৯৯৭-৯৮, ২০১৫-১৬ এবং ২০২৩-২৪ সালের এল নিনো বিশেষভাবে আলোচিত। এর মধ্যে ১৯৯৭-৯৮ এবং ২০১৫-১৬ সালের এল নিনোকে গত শতাব্দীর অন্যতম শক্তিশালী এল নিনো হিসেবে ধরা হয়।
কেন এল নিনো নিয়ে এত উদ্বেগ?
এল নিনো শুধুমাত্র সমুদ্রের তাপমাত্রা বৃদ্ধি করে না; এটি পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের আবহাওয়ার ধরণ বদলে দিতে পারে।
এল নিনোর সময় সাধারণত—
- বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধি পায়।
- তাপপ্রবাহের সংখ্যা ও তীব্রতা বাড়ে।
- অনেক অঞ্চলে খরা দেখা দেয়।
- কিছু অঞ্চলে অতিবৃষ্টি ও বন্যা হয়।
- বনভূমিতে অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়।
- কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে।
- খাদ্য ও পানির নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়তে পারে।
- বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়।
বর্তমানে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে বিজ্ঞানীরা আশঙ্কা করছেন যে ভবিষ্যতের এল নিনো ঘটনাগুলো আরও তীব্র প্রভাব ফেলতে পারে।
২০২৬ সালে এল নিনো নিয়ে কী বলছে আন্তর্জাতিক আবহাওয়া সংস্থাগুলো?
বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (WMO) এবং আন্তর্জাতিক জলবায়ু বিশেষজ্ঞদের সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, প্রশান্ত মহাসাগরের তাপমাত্রা দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে এবং এল নিনো পরিস্থিতি গঠনের অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়েছে।
সর্বশেষ পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের মাঝামাঝি সময়ে এল নিনো বিকশিত হওয়ার সম্ভাবনা অত্যন্ত বেশি। বছরের দ্বিতীয়ার্ধে এটি আরও শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে বলেও আশঙ্কা করা হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক আবহাওয়া বিশ্লেষকরা সতর্ক করছেন যে এল নিনো সক্রিয় হলে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে তীব্র গরম, দীর্ঘস্থায়ী খরা, অতিবৃষ্টি এবং চরম আবহাওয়ার ঘটনা বাড়তে পারে। একই সঙ্গে কৃষি, খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থা এবং পানিসম্পদের ওপরও এর প্রভাব পড়তে পারে।
এ কারণেই বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ইতোমধ্যে দেশগুলোকে আগাম প্রস্তুতি গ্রহণ, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা জোরদার এবং খাদ্য নিরাপত্তা পরিকল্পনা শক্তিশালী করার আহ্বান জানিয়েছে।
কোমল পানীয়-এর ভয়াবহতা জানতে এখানে ক্লিক করুন
বাংলাদেশের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব
বাংলাদেশে এল নিনোর প্রভাব প্রতি বছর একই রকম হয় না। তবে অতীতের অভিজ্ঞতা ও জলবায়ু বিশ্লেষণ থেকে কয়েকটি সম্ভাব্য প্রভাব চিহ্নিত করা যায়।
- গ্রীষ্মকালে তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি হতে পারে।
- দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহ দেখা দিতে পারে।
- কিছু অঞ্চলে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ কমে যেতে পারে।
- খরার ঝুঁকি বাড়তে পারে।
- কৃষিক্ষেত্রে সেচের চাহিদা বৃদ্ধি পেতে পারে।
- পানির উৎসগুলোর ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হতে পারে।
- ধান, গম, ভুট্টাসহ বিভিন্ন ফসলের উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
- বিদ্যুতের চাহিদা বেড়ে যেতে পারে।
- বিশেষ করে দেশের উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চল তুলনামূলক বেশি প্রভাবিত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকে।
এল নিনোর প্রভাব মোকাবিলায় ব্যক্তিগতভাবে কী করা যায়?
চরম গরম ও সম্ভাব্য খরার পরিস্থিতিতে কিছু সাধারণ সতর্কতা বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি কমাতে সাহায্য করতে পারে।
- পর্যাপ্ত পানি পান করতে হবে।
- অপ্রয়োজনীয়ভাবে রোদে বের হওয়া কমাতে হবে।
- হালকা ও আরামদায়ক পোশাক পরতে হবে।
- শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ ব্যক্তিদের প্রতি বিশেষ যত্ন নিতে হবে।
- হিটস্ট্রোকের লক্ষণ সম্পর্কে সচেতন থাকতে হবে।
- বাসা ও কর্মস্থলে পর্যাপ্ত বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা রাখতে হবে।
- প্রয়োজনে ওরস্যালাইন ও তরলজাতীয় খাবার গ্রহণ করতে হবে।
কৃষিক্ষেত্রে করণীয়
কৃষকদের জন্য আগাম প্রস্তুতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ:
- পানি সাশ্রয়ী সেচ ব্যবস্থা ব্যবহার করা।
- খরা সহনশীল জাতের ফসল চাষ করা।
- বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা।
- কৃষি বিভাগের আবহাওয়া পূর্বাভাস নিয়মিত অনুসরণ করা।
- জলাধার ও সেচ ব্যবস্থার রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করা।
- ফসল বৈচিত্র্যকরণের দিকে গুরুত্ব দেওয়া।
এল নিনো কি থামানো সম্ভব?
সংক্ষিপ্ত উত্তর হলো—না।
এল নিনো একটি প্রাকৃতিক জলবায়ুগত চক্র। মানুষের পক্ষে এটিকে সরাসরি থামানো বা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। এটি পৃথিবীর সমুদ্র ও বায়ুমণ্ডলের স্বাভাবিক পারস্পরিক ক্রিয়ার অংশ।
তবে বিজ্ঞানীরা মনে করেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এল নিনোর প্রভাব আরও তীব্র হতে পারে। তাই বৈশ্বিক উষ্ণায়ন কমাতে পারলে এল নিনোর ক্ষতিকর প্রভাবও অনেকাংশে সীমিত রাখা সম্ভব।
এল নিনোর প্রভাব কমাতে বিশ্ববাসী কী করতে পারে?
যদিও এল নিনোকে বন্ধ করা সম্ভব নয়, তবে এর প্রভাবকে তীব্রতর করে তোলা জলবায়ু পরিবর্তনের গতি কমানো সম্ভব।
জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমানো
কয়লা, তেল ও গ্যাস ব্যবহারের ফলে বিপুল পরিমাণ কার্বন ডাই-অক্সাইড বায়ুমণ্ডলে জমা হয়। এসব জ্বালানির ব্যবহার কমিয়ে পরিবেশবান্ধব শক্তির দিকে ঝুঁকতে হবে।
বন সংরক্ষণ ও বৃক্ষরোপণ
গাছপালা বায়ুমণ্ডল থেকে কার্বন শোষণ করে। তাই বন উজাড় বন্ধ এবং ব্যাপক বৃক্ষরোপণ জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার অন্যতম কার্যকর উপায়।
নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি
সৌরশক্তি, বায়ুশক্তি ও জলবিদ্যুতের মতো পরিচ্ছন্ন শক্তির ব্যবহার বাড়ালে কার্বন নিঃসরণ কমানো সম্ভব।
জ্বালানি সাশ্রয়ী জীবনযাপন
অপ্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ ব্যবহার কমানো, জ্বালানি সাশ্রয়ী যন্ত্রপাতি ব্যবহার এবং গণপরিবহনের ব্যবহার বাড়ানো পরিবেশ সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
দূষণ ও প্লাস্টিক ব্যবহার কমানো
পরিবেশ দূষণ কমানো এবং একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের ব্যবহার হ্রাস করা দীর্ঘমেয়াদে জলবায়ু সুরক্ষায় সহায়ক।
আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি
জলবায়ু পরিবর্তন একটি বৈশ্বিক সমস্যা। তাই বিশ্বের সব দেশকে একসঙ্গে কাজ করে কার্বন নিঃসরণ কমানো, পরিবেশ রক্ষা এবং দুর্যোগ মোকাবিলা সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
গবেষণা ও আগাম সতর্কতা ব্যবস্থায় বিনিয়োগ
উন্নত আবহাওয়া পূর্বাভাস ব্যবস্থা, স্যাটেলাইট পর্যবেক্ষণ, জলবায়ু গবেষণা এবং দুর্যোগ প্রস্তুতি কর্মসূচি এল নিনোর ক্ষয়ক্ষতি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় বিশেষজ্ঞদের মতে, এল নিনোকে আতঙ্কের বিষয় হিসেবে নয়, বরং একটি বাস্তব জলবায়ুগত চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা উচিত। সময়মতো প্রস্তুতি, সঠিক তথ্য এবং সচেতন পরিকল্পনার মাধ্যমে এর সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব।
